জগৎজ্যোতির দ্যুতি:
পঞ্চাশের দশকে বর্তমান সুরমা মার্কেট সংলগ্ন প্রিয় নদী সুরমার দক্ষিণ তীরে সুনামগঞ্জ স্টিমার ঘাট ছিল। হুইসেল, ভেপু বাজিয়ে স্টিমার জাহাজ ভিড়ত সুনামগঞ্জ শহরে। সুদূর কলকাতা থেকে স্টিমার আসত। স্টিমার ঘাট থেকে দক্ষিণে প্রসারিত সড়ক চলে গেছে। দক্ষিণমুখি রাস্তা দিয়ে সামান্য এগুলে ডানদিকে পশ্চিম বাজারে তখন মাছ বাজার ছিল এবং পূর্ব দিকে জগন্নাথ বাড়ি। স্টিমার ঘাট থেকে দক্ষিণমুখি রাস্তাটি এগিয়ে বর্তমান আলফাত স্কয়ার (ট্রাফিক পয়েন্ট) এর বাম অংশে সুনামগঞ্জ কলেজ। কাঠের পাটাতনের দ্বিতল টিনকাঠের উত্তর দক্ষিণে লম্বমান কলেজটির দক্ষিণ অংশে পাকা সিঁড়ি ছিল। জনসভার মঞ্চের মত পাকা সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে জ্বালাময়ী বক্তৃতা হতো। তখনকার নাম ছিল সুনামগঞ্জ কলেজ প্রাঙ্গণ। মহান মুক্তিযুদ্ধের পূর্ববর্তী সময়কাল এবং তৎপরবর্তী অনেক বছর আমাদের শহরের প্রাণকেন্দ্র হিসাবে মিছিল-মিটিং ও আড্ডায় সরগরম থাকত এই কলেজ প্রাঙ্গণ। এর সোজা দক্ষিণ দিকে বাসস্টেন্ড ছিল। পয়েন্ট থেকে পূর্বমুখি রাস্তার বামপাশে প্রথম চৌচালা (বর্তমানে শহীদ মিনার সংলগ্ন) বাংলো বাড়িটি সুনামগঞ্জের মহকুমা মুনসেফ সাহেবের বাসভবন ছিল। এর পরেই বিশাল পুকুর পানিতে টইটুম্বুর থাকত। এর উত্তরপাড়ে সুনামগঞ্জ সিভিল হসপিটেল (হাসপাতাল)। পুকুরের পূর্বপাড়ে চৌচালা বাংলো টাইপের ভবনটিতে তৎকালীন লোকাল বোর্ডের অফিস ছিল। যা আমাদের গৌরবের এই পাঠাগার। এর ঠিক পূর্বদিকে উত্তরমুখি ছনের ছানিযুক্ত চৌচালা অভিজাত এস ডি ও বাংলো ছিল। সম্ভবত সুরমা নদীর প্রাণখোলা সুবাতাস ও উত্তরপাড়ের মায়াবি পাহাড়ের হাতছানি দেখার জন্য এভাবেই বাংলোটি তখন উত্তরমুখি ছিল। লোকাল বোর্ডের অফিসের দক্ষিণে সুনামগঞ্জ থানা, পূর্বমুখি রাস্তায় সামনে এগুলে ডানে কোর্টকাচাড়ি, বামে জুবিলী স্কুল। এরূপ স্বপ্নীল শহরের প্রাণকেন্দ্রে বর্ণিত লোকাল বোর্ডের অফিসে গোড়াপত্তন হয় এই পাঠাগারটির।
১৯৫৯ সালের ১৭ জুন, দিনটি ছিল বুধবার। তখনকার মহৎপ্রাণ কয়েকজন স্বপ্নবান প্রাজ্ঞপুরুষ লোকাল বোর্ডের মিলনায়তনে বসেছিলেন একটি পাঠাগার প্রতিষ্ঠার দূরদর্শী চিন্তা নিয়ে। তখন সুনামগঞ্জে বলতে গেলে কিছুই ছিল না, না ছিল বিদ্যুত, না ছিল তেমন কোনও যোগাযোগ অবকাঠামো। এমনকি পুরাতন কলেজ থেকে পূর্বমুখি রাস্তাটি রজন্তির পয়েন্ট (বর্তমান উকিল পাড়া পয়েন্ট) পর্যন্ত সামান্য কিছু পাকা অংশ ছাড়া শহরের বাকি সবকটি রাস্তাই ছিল কাঁচা, নুড়িপাথর বসানো। কোন রিকসা ছিল কিনা এ বিষয়ে মতান্তর থাকলেও কয়েকটা বাইসাইকেল আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে তখন দেখা যেত। এরকম একটা পিছিয়ে পড়া সময়ে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার এই উদ্যোগ সত্যিই অকল্পনীয়।
প্রতিষ্ঠাকাল ১৯৫৯ খ্রি. থেকে ১৯৭১ সনের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত পাঠাগারটি 'সুনামগঞ্জ পাবলিক লাইব্রেরি' নামে পরিচিত ছিল। মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে অকুতোভয় বীর মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি দাস বীর বিক্রমের নামে নামকরণ করা হয় 'শহীদ মুক্তিযোদ্ধা জগৎজ্যোতি পাবলিক লাইব্রেরি'। ১৯৫৯ খ্রি. থেকে ২০১৭ খ্রি. পর্যন্ত ২১ জন মহকুমা ও জেলা প্রশাসক সভাপতি হিসেবে এবং ৯ জন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে পাঠাগারের বই সংখ্যা একুশ হাজারের উপরে। ওয়েব সাইটে বই নিবন্ধনের কাজ চলমান আছে। দাতা সদস্য, আজীবন সদস্য, সাধারণ সদস্য ও ছাত্র/ছাত্রী সদস্য হিসেবে পাঠাগারের সদস্যপদ গ্রহণ করা যায়। রবিবার ও সরকারী ছুটি ছাড়া প্রতিদিন বিকাল ৩.৩০ ঘটিকা থেকে রাত ৮.৩০ ঘটিকা পর্যন্ত পাঠাগারটি সর্বসাধারণের জন্য খোলা থাকে। প্রায় সবগুলো জাতীয় দৈনিক, সাপ্তাহকি, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও নিজস্ব উদ্যোগে পাঠাগারে নিয়মিত রাখা হয়। সংরক্ষিত বই ছাড়া বাড়িতে নিয়ে বই পড়ার সুযোগ আছে। নিচতলার পাঠকক্ষে গড়ে প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন পাঠক প্রতিদিন আগমন করেন। পাঠাগারের দ্বিতল অংশে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত ২২০টি আসনের মিলনায়তন আছে, যা ভাড়া প্রদানে পাঠাগারের ব্যয়নির্বাহ হয়।
২০১৭ সনে আমরা এই ওয়েব সাইট চালু করেছি। ভবিষ্যতে সকলের সহযোগিতায় পাঠাগারটি আরো উন্নত হবে। নতুন নতুন বই, জার্নাল, গবেষণা পত্র ইত্যাদিতে সমৃদ্ধ হবে আমাদের স্বপ্নের এই পাঠাগার। জ্ঞানের স্নিগ্ধ আলো বিচ্ছূরিত হোক সবখানে। সবার সহযোগিতায় এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান বেঁচে থাকুক অনন্তকাল।